ইভ্যালির রাসেলের উত্থান যেভাবে

0

দেশের আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেল এবং তার স্ত্রী শামীমা নাসরিনকে আটক করেছে র‍্যাব। শামীমা নাসরিন ইভ্যালির চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। এর আগে বুধবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাতে তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ঢাকার গুলশান থানায় প্রতারণার মামলা দায়ের করেন একজন গ্রাহক।

অভিযানের পর র‍্যাব ইন্টেলিজেন্স-এর প্রধান খায়রুল ইসলাম এ দুজনকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

ইভ্যালি মূলত বাংলাদেশ ভিত্তিক একটি ই-কমার্স প্লাটফর্ম। অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে লোভনীয় ডিসকাউন্ট কিংবা ক্যাশব্যাকের অফার দিয়ে দারুণভাবে সবার নজরকাড়ে ইভ্যালি। অল্প সময়ে অনলাইন ক্রেতাদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও প্রতিষ্ঠানটি এখন গ্রাহক ভোগান্তি ও সমালোচনার শীর্ষে অবস্থান করছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মোহাম্মদ রাসেল প্রতিষ্ঠা করেন এই প্লাটফর্মটি।

কিন্তু, জনমনে এখন প্রশ্ন উঠেছে, কে এই মোহাম্মদ রাসেল? কি তাঁর পরিচয়?

জানা গেছে, মোহাম্মদ রাসেল রাজধানীর রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করেন। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে ২০১১ সালে ঢাকা ব্যাংকে যোগদান করেন। চাকরির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ-ও কমপ্লিট করেন রাসেল। এর পাঁচ বছর পর ঢাকা ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে অনলাইনে পণ্য বেচাকেনার ব্যবসা শুরু করেন।

২০১৬ সালে প্রথমে অনলাইনে ডায়াপার বিক্রির মাধ্যমে এই যাত্রা শুরু করেন রাসেল। ২০১৭ সালে এই ব্যবসা করতে গিয়ে বড় একটি অনলাইন প্লাটফর্মের কথা চিন্তা করেন তিনি। সেই চিন্তা থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইভ্যালি’। তাঁর নৈপূণ্যে প্রায় ১৭ লাখ নিয়মিত ক্রেতা, ২০ হাজারের বেশি বিক্রেতা নিয়ে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে অতি অল্প সময়েই প্রথম সারিতে উঠে আসে ‘ইভ্যালি’।

একইসঙ্গে এশিয়ার মধ্যে স্বল্প সময়ে দ্রুতবর্ধনশীল ই-কমার্স স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি ও বিজনেস লিডার হিসেবে অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন মোহাম্মদ রাসেল।

মোটরসাইকেল, গাড়ি, মোবাইল, ঘরের সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্রের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যে লোভনীয় ছাড় দেয় ইভ্যালি। প্রতিষ্ঠার শুরুতে সাইক্লোন, আর্থকোয়াক (ভূমিকম্প) ইত্যাদি নামে তারা ক্রেতাদের ১০০ শতাংশ ও ১৫০ শতাংশ ক্যাশব্যাকের মতো অত্যন্ত লোভনীয় অফার দেয়। ইভ্যালির ব্যবসার এ কৌশলটি মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি অনেক সমালোচনারও জন্ম দেয়।

বিশাল বিশাল অফার, ছাড়ের ছড়াছড়ি আর ক্যাশব্যাকের লোভনীয় আকর্ষণ দেখিয়ে ক্রেতা বাড়ানোর কৌশল নিয়ে সফল হলেও প্রতিষ্ঠানটি এখন গ্রাহক ভোগান্তির শীর্ষে। ইভ্যালির ‘সম্পদের চেয়ে ছয় গুণ বেশি দেনা’ শিরোনামে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে যাবতীয় তথ্য। প্রতিবেদনে উঠে আসে ইভ্যালির মোট দায় ৪০৭ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম নিয়েছে ২১৪ কোটি টাকা, আর মার্চেন্টদের কাছ থেকে বাকিতে পণ্য নিয়েছে ১৯০ কোটি টাকার। স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিষ্ঠানটির কাছে কমপক্ষে ৪০৪ কোটি টাকার চলতি সম্পদ থাকার কথা। কিন্তু সম্পদ আছে মাত্র ৬৫ কোটির।

এছাড়া গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছ থেকে গত ১৪ মার্চ পর্যন্ত ইভ্যালির নেয়া অগ্রিম ৩৩৯ কোটি টাকার কোনো হদিসই পাওয়া যাচ্ছে না। এতো টাকা আত্মসাৎ বা অবৈধভাবে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার আশঙ্কা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

যদিও গত ১৯ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে তাদের সম্পদ ও দা‌য়ের হিসাব দেয় ইভ্যালি। প্র‌তিষ্ঠানটি জানায়, তার নিজের ব্র্যান্ড ভ্যালু ৪২৩ কোটি টাকার। যদিও গত ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাদের মোট দায় ৫৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে শেয়ারহোল্ডার হিসেবে কোম্পানির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেল কোম্পানিকে দিয়েছেন এক কোটি টাকা। বাকি ৫৪৩ কোটি টাকা হচ্ছে কোম্পানিটির চলতি দায়।

ইভ্যালি জানায়, দায়ের বিপরীতে তাদের চলতি সম্পদ রয়েছে ৯০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আর সম্পত্তি, স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি মিলিয়ে রয়েছে ১৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। সব মি‌লি‌য়ে কোম্পানিটির স্থাবর সম্পত্তি দাঁড়ায় ১০৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। যা মোট দায় ৫৪৪ কোটি টাকা থেকেও ৪৩৯ কোটি টাকা কম, যাকে অস্থাবর সম্পত্তি বলছে ইভ্যালি।

সম্পদবিবরণী মেলাতে ইভ্যালি দেখিয়েছে অস্থাবর সম্পত্তি ৪৩৮ কোটি টাকার মধ্যে ৪২৩ কোটি টাকা হচ্ছে তার ব্র্যান্ড ভ্যালু, আর ১৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা হচ্ছে অদৃশ্য সম্পত্তি।

সব মি‌লি‌য়ে ইভ্যালির মোট দেনার পরিমাণ ৫৪২ কোটি ৯৯ লাখ ৫৮ হাজার ৪৮২ টাকা। এই দেনার বিপরীতে তাদের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদ রয়েছে ৫৪৩ কোটি ৯৯ লাখ ৫৮ হাজার ৪৮২ টাকা।

তবে তাদের এই হিসাব বিবরণীতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। যার প্রেক্ষিতে ইভ্যালির ভবিষ্যৎ নিয়ে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ওই মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় ইভ্যালির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সুপারিশও করা হয়। যার প্রেক্ষিতে আজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলেন রাসেল দম্পতি।

Leave A Reply

Your email address will not be published.