ওয়াশিংটন ডিসিতে বর্ণাঢ্য সমাবেশ

0

সোমবার সন্ধ্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ দূতাবাস, ওয়াশিংটন ডিসি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর, পদ্মা ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত প্রমুখ।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০তম বার্ষিকী স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যায় ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসে বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাইডেন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও বেশ কটি দেশের শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক, মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন বন্ধু, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্বকারী প্রবাসীরা ছিলেন। করোনার পরিপ্রেক্ষিতে আমন্ত্রণ সীমিত রাখা হলেও অতিথিরা উৎসবের মেজাজে সপরিবারে আসায় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় মিলনায়তনটি। রাষ্ট্রদূত এম শহিদুল ইসলামসহ দূতাবাসের পদস্থ কর্মকর্তারা অতিথিদের লাল গালিচা অভ্যর্থনা জানান।

দুই দেশের জাতীয় সংগীতের পর আলোচনার শুরুতেই এ উদ্যাপন উপলক্ষে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনের ভিডিওতে ধারণকৃত বক্তব্য প্রচার করা হয়। এতে ব্লিনকেন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে গত ৫০ বছরে তা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংকট নিরসনে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন অগ্রসরতায় বাংলাদেশের তথা বাংলাদেশিদের ভূমিকা রয়েছে উল্লেখ করে ব্লিনকেন বলেন, ১৯৭২ সালে ফজলুর রহমান খান যুক্তরাষ্ট্রে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে এসেছিলেন এবং এখানে পিএইচডি ও দুটি মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিলেন। ১৯৭২ সালে দুই দেশের সম্পর্ক স্থাপনের এক বছর পর ১৯৭৩ সালে তিনি সিয়ার্স করপোরেশনের মতো অত্যাধুনিক স্কাইস্ক্র্যাপার ডিজাইন করেছিলেন, তখন থেকেই সেই টাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের ক্ল্যাসিক স্কাইলাইনের প্রতীক হয়ে রয়েছে, স্মরণ করেন ব্লিনকেন। তিনি বলেন, এই একটি বিষয়ই বলে দেয় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কী করতে পারে। ব্লিনকেন বলেন, আগামী দিনগুলোয় আমাদের দুই দেশের জনগণ মিলে ভবিষ্যৎ সম্পর্কটি কীভাবে এগিয়ে নেবে সেদিকেই আমরা তাকিয়ে আছি।
এ সময় প্রদত্ত বক্তব্যে ইউএসএইডের উপপ্রশাসক এবং রাষ্ট্রদূত ইসোবেল কোলমেন সম্পর্কের এ ধারা আরও গভীর এবং বিস্তৃত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের দিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র নিরবচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশের পাশে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সম্পর্কের পরিধি আরও নিবিড় হয়েছে। যার পথ বেয়ে বাংলাদেশ কাক্সিক্ষত উন্নয়নে ধাবিত হচ্ছে। জীবনমানের উন্নয়নে বাংলাদেশ অবিস্মরণীয় অগ্রগতি সাধনে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন ইউএসএইডের ডেপুটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ইসোবেল কোলম্যান। তিনি বাংলাদেশ যেসব খাতে অগ্রসর হয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে তা উল্লেখ করে বলেন, আমি লক্ষ্য করেছি বাংলাদেশ গত কয়েক দশক ধরেই তার জনগণের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পেরেছে। এবং বিশ্বের কাছে সাফল্যের উদাহরণ হয়ে ধরা দিয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ যে অগ্রসরতা নিশ্চিত করেছে তা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য ও উদ্যাপনের দাবি রাখে। আজ বিশ্বের অগ্রসরমান অর্থনীতির কাছে বাংলাদেশ একটি মডেল এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। দূতাবাসের রাজনীতিবিষয়ক মিনিস্টার দেওয়ান আলী আশরাফের সঞ্চালনায় এ আনন্দ সমাবেশের প্রধান অতিথি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে এ মোমেন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্কের সুফলগুলো সংক্ষেপে আলোকপাত করেন। পরস্পরের সহযোগী হওয়ায় উভয়েই উপকৃত হচ্ছি এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত ক্রমান্বয়ে মজবুত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন ড. মোমেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন বলেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপনের এ সন্ধ্যায় আপনাদের সবার সামনে উপস্থিত হতে পেরে খুশি লাগছে। আজ দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেনের সঙ্গে অত্যন্ত সফল একটি বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া ইউএসএআইডির প্রধান সামান্থা পাওয়ারের সঙ্গে আমার বৈঠক হয়েছে এবং দুটি বৈঠকই ছিল ফলপ্রসূ। আমরা আগামী দিনগুলোয় বৈশ্বিক সম্পর্ক কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা করেছি।

দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাঠানো চিঠির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন ড. মোমেন। বাইডেন তাঁর চিঠিতে গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দিকগুলো উল্লেখ করে বলেছেন বাংলাদেশ এখন অগ্রসরতার দিক থেকে একটি মডেল এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভালো বন্ধু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে বাইডেন আশা প্রকাশ করেছেন আগামী ৫০ বছরে দুই দেশের জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে অংশীদারি ও সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশ গভীরভাবে মূল্যায়ন করে এমনটা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংহতি ও সাধারণ মূল্যবোধের ভিত্তিতে গঠিত এ সম্পর্ক?। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আর্থসামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে তা অব্যাহতভাবে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে এবং ৫০ বছরে তা একটি শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০২২ সাল হচ্ছে সেই সম্পর্ক উদ্যাপনের বছর। বছরজুড়ে আমরা দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সম্পর্কের শক্তির দিকটি প্রদর্শনের যেমন সুযোগ পেয়েছি তেমনি করে এ সম্পর্ককে আরও গভীরতার দিকে নিয়ে যেতে করণীয় নির্দেশ করতে পেরেছি।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে অংশীদারি সংলাপের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত জানান, গত ২০ মার্চ ঢাকায় অষ্টম অংশীদারি সংলাপ সম্পন্ন হয়েছে, ৬ এপ্রিল ওয়াশিংটনে হবে অষ্টম নিরাপত্তা সংলাপ এবং নবম প্রতিরক্ষা সংলাপ আগামী মে মাসের প্রথম ভাগে হবে হাওয়াইয়ে, জুনে হবে উচ্চ পর্যায়ের দ্বিতীয় বাণিজ্য সংলাপ। এ ছাড়া মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চ পর্যায়ের বাণিজ্যিক দল বাংলাদেশ সফর করবে। এসব কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারে ভূমিকা রাখবে বলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রসরতা কেবল আমাদের নিজস্ব জনগণের জন্যই উপকার বয়ে আনছে না, বিশ্বময় শান্তি-সমৃদ্ধি অগ্রসরতা নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখছে, বলেন রাষ্ট্রদূত। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্মসম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ এমপি এবং নাহিম রাজ্জাক এমপি। আরও ছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ ও সেন্ট্রাল এশিয়া বিষয়ক উপসহকারী মন্ত্রী রাষ্ট্রদূত কেলি কিডারিং, ইউএসএইডের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অঞ্জলি কাউর, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল ওয়াকারউজ্জামান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. কামরুল হাসান, আইন, বিচার ও সংসদীয় বিষয়ক সচিব মো. গোলাম সারোয়ার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব সাব্বির আহমেদ চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম, সমাজসেবী সেলিনা মোমেন প্রমুখ।

বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে ছিলেন বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর, পদ্মা ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল ড. মনিরুল ইসলাম, ভার্জিনিয়াস্থ গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ, ট্রেজারার ফারহানা হানিপ, যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের কমিউনিকেশন ডিরেকটর বীর মুক্তিযোদ্ধা লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা রাশেদ আহমেদ এবং কোষাধ্যক্ষ বিশ্ববাংলা টোয়েন্টিফোর টিভির সিইও আলিম খান আকাশ, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা মোর্শেদ আলম, অধ্যাপক আদনান মোর্শেদ, এনআরবি সেন্টারের শেকিল চৌধুরী প্রমুখ। শেষ পর্বে স্থানীয় শিল্পীদের দেশাত্মবোধক গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনের আগে সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিপুল করতালির মধ্যে কেক কাটেন অতিথিরা। এর পরই সবাই ইফতার/ডিনার গ্রহণ করেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.