কম পরীক্ষা দিয়ে বেশি পাসের রেকর্ড

0

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে মাত্র তিনটি নৈর্ব্যচনিক বিষয়ে। আবশ্যিক বিষয়গুলো বাদ দিয়ে পুনর্বিন্যস্ত (স্বল্প) সিলেবাসে নেওয়া এই পরীক্ষার ফলাফলে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। কম বিষয়ে কম সিলেবাসে পরীক্ষা দেওয়ায় তুলনামূলক ভালো করেছেন ছাত্র-ছাত্রীরা। এ পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গতকাল প্রকাশিত ২০২১ সালের এইচএসসি ও সমমানের ফলাফলে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১৩ লাখ ৭১ হাজার ৬৮১ জন ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ১৩ লাখ ৬ হাজার ৭১৮ জন। পাসের হার ৯৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষার্থী। পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে গতকাল বেলা ১১টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি এ অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। পরে দুপুর ১২টায় ফলাফলের বিভিন্ন দিক নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ফলাফলে দেখা গেছে, ৯টি সাধারণ বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১১ লাখ ১৫ হাজার ৭০৫ জন। এদের মধ্যে পাস করেছেন ১০ লাখ ৬৬ হাজার ২৪২ জন। পাসের হার ৯৫ দশমিক ৫৭ ভাগ। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিমে ১ লাখ ৬ হাজার ৫৭৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ১ লাখ ১ হাজার ৭৬৮ জন। এ বোর্ডে পাসের হার ৯৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪ হাজার ৮৭২ শিক্ষার্থী। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩৯৭ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৮ জন। এ বোর্ডে পাসের হার ৯২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। কারিগরি বোর্ডে জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৫ হাজার ৭৭৫ শিক্ষার্থী। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৯৬ দশমিক ২০, রাজশাহী বোর্ডে ৯৭ দশমিক ২৯, কুমিল্লা বোর্ডে ৯৭ দশমিক ৪৯, যশোর বোর্ডে পাসের হার ৯৮ দশমিক ১১, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৮৯ দশমিক ৩৯, বরিশাল বোর্ডে ৯৫ দশমিক ৭৬, সিলেট বোর্ডে ৯৪ দশমিক ৮, দিনাজপুর বোর্ডে ৯২ দশমিক ৪৩, ময়মনসিংহ বোর্ডে ৯৫ দশমিক ৭১ শতাংশ পাস করেছেন। ঢাকা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৫৯ হাজার ২৩৩ জন, রাজশাহী বোর্ডে ৩২ হাজার ৮০০, কুমিল্লা বোর্ডে ১৪ হাজার ১৫৩, যশোর বোর্ডে ২০ হাজার ৮৭৮, চট্টগ্রাম বোর্ডে ১৩ হাজার ৭২০, বরিশাল বোর্ডে ৯ হাজার ৯৭১, সিলেট বোর্ডে ৪ হাজার ৭৩১, দিনাজপুর বোর্ডে ১৫ হাজার ৩৪৯ ও ময়মনসিংহ বোর্ডে ৭ হাজার ৬৮৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এইচএসসি ও সমমানের বাংলা, ইংরেজি, আইসিটিসহ আবশ্যিক বিষয়গুলোর পরীক্ষা না নিয়ে জেএসসি-জেডিসি ও এসএসসি-সমমানের ফল থেকে সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে জেএসসি-সমমানের ২৫ শতাংশ এবং এসএসসি-সমমানের ৭৫ শতাংশ নম্বর বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। নম্বর ও সময় কমিয়ে এ এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র তিনটি বিষয়ের ছয়টি পত্রে পরীক্ষা নেওয়ায় ভালো ফল করেছেন তারা। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় এসব বিষয়ের সিলেবাসও একেবারেই কমিয়ে দেওয়া হয়। সামগ্রিকভাবে এটি ভালো ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। এর আগে ইংরেজিতে ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকে খারাপ করলেও এবার পরীক্ষাই নেওয়া হয়নি এ বিষয়ে। এ কারণেও বেড়েছে পাসের হার। আর ভালো ফলে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে সাবজেক্ট ম্যাপিং।

পাসের হারে শীর্ষে যশোর, জিপিএ-৫ এ ঢাকা বোর্ড : এইচএসসিতে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে যশোর বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৯৮ দশমিক ১১ শতাংশ। পাসের হারে পিছিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ডে পাসের হার ৮৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এ ছাড়া জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকেও অন্যান্য বছরের মতো এবারও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে ৫৯ হাজার ২৩৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

পাসের হারে এগিয়ে মেয়েরা : এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হারে ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন মেয়েরা। ছেলেদের পাসের হার ৯৪ দশমিক ১৪ শতাংশ, আর মেয়েদের ৯৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছেন মেয়েরা। এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ লাখ ২ হাজার ৪০৬ জন ছাত্রী। আর ছাত্রদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৭৬৩ জন।
পাঁচ কলেজে সবাই ফেল : এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১ হাজার ৯৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছেন। অন্যদিকে ৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করতে পারেননি।
বিদেশ কেন্দ্রে পাস ৯৮ দশমিক ৮৮ : বিদেশের আটটি কেন্দ্রে মোট ২৬৭ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২৬৪ জন। পাসের হার ৯৮ দশমিক ৮৮ ভাগ। এদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৯২ জন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও ফলাফল উপলক্ষে কলেজ ক্যাম্পাসে জড়ো হয়েছিলেন ছাত্র-ছাত্রীরা। ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কলেজ ক্যাম্পাসে নেচে গেয়ে উৎসবে মেতে ওঠেন তারা। এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের শিক্ষার্থীরা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ পরীক্ষার্থী পাস করেছেন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ হাজার ৬৫৯ জন।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২ হাজার ২৩০ জন ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২ হাজার ২২৮ জন। জিপিএ ৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৮০ জন।

বিজ্ঞানেও ভালো ফল ঢাকা কমার্স কলেজে : ঢাকা কমার্স কলেজে ব্যবসায় শিক্ষায় ১ হাজার ৩০৭ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ১ হাজার ৩০৫ জন। পাসের হার ৯৯ দশমিক ৮৫। জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৩০৯ জন। বিজ্ঞানে ১ হাজার ৮৬ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ১ হাজার ৮১ জন। পাসের হার ৯৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৬৬৮ জন। বিজ্ঞান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এবারই প্রথম ছিল কলেজটির। এ কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টার ফলে ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করছে এ কলেজ। সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৯৬৮ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৯৬৬ জন। এদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৭০৬ জন। পাসের হার ৯৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। মাইলস্টোন কলেজ থেকে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে ২ হাজার ৮৭৮ জন ছাত্র-ছাত্রী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শতভাগ পাস করেছেন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন হাজার ৮২৯ জন।

ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন শুরু আজ : আন্তশিক্ষা সমন্বয়ক বোর্ড সূত্র জানায়, আজ সোমবার এইচএসসি ও সমমানের ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা যাবে। আবেদন চলবে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট (www.dhakaeducationboard.gov.bd) থেকে বিস্তারিত জানা যাবে। প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত ২০২০ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। এসএসসি ও সমমান এবং জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে এইচএসসির ফল প্রকাশ করা হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published.