সম্পাদক পরিষদের সেমিনারে বিশিষ্টজন সংবাদপত্রের বিকাশ ছাড়া গণতন্ত্র বিকশিত হয় না

0

শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত ‘৫০ বছরের বাংলাদেশ: গণমাধ্যমের অর্জন ও আগামীর চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনা সভার মঞ্চে অতিথি ও আলোচকবৃন্দ-

গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছাড়া সংবাদপত্র বিকশিত হয় না, সংবাদপত্রের বিকাশ ছাড়া গণতন্ত্রের চর্চাও নিশ্চিত হয় না। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাই সংবাদপত্রের টিকে থাকার প্রধান শর্ত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারা সেই সাংবাদিকতাকেই সংকুচিত করছে। বিতর্কিত এই আইন দেশকে সাইবার অপরাধ থেকে সুরক্ষা দিতেও ব্যর্থ হয়েছে। এ আইনের সংস্কার এবং নিবর্তনমূলক ধারাগুলো বাতিল করা জরুরি। গতকাল শনিবার সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত সেমিনারে বিশিষ্টজন এ কথা বলেছেন।

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘৫০ বছরের বাংলাদেশ: গণমাধ্যমের অর্জন ও আগামীর চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে আয়োজিত সেমিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের সভাপতিত্বে এই আলোচনায় প্যানেল আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অনারারি অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান, নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীর, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত এবং সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন ফাইন্যান্সিয়াল হেরাল্ড সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান এবং চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক। সেমিনার সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গণমাধ্যমকর্মী সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। সভার শুরুতে সম্পাদক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি গোলাম সারওয়ারসহ প্রয়াত অন্য সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

মূল বক্তব্যে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, গত ৫০ বছরে গণমাধ্যম, বিশেষ করে সংবাদপত্রের অর্জন অনেক। নানা সংকট ও প্রতিকূলতার মধ্যেও সংবাদপত্র গত ৫০ বছরে একটি স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। অনলাইন এবং দৃশ্য মাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের মধ্যেও সংবাদপত্র এখনও বাংলাদেশে সংবাদের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবেই টিকে আছে। সাংবাদিকরা যে বেতন পান, সম্ভবত এত কম বেতন অন্য কোনো পেশায় নেই। তবু সাংবাদিকতায় তারুণ্যের সমাবেশ দেখা যাচ্ছে। তরুণ সম্পাদক দেখা যাচ্ছে। এটাও বড় অর্জন। এ অর্জনকে খাটো করে দেখার উপায় নেই।

তিনি সংবাদপত্রের সামনে চ্যালেঞ্জের উল্লেখ করে বলেন, চ্যালেঞ্জ দু’দিক থেকে আসে। একটা ভেতর থেকে, আর একটা বাইরে থেকে। সাংবাদিক সংগঠনগুলো দলীয় রাজনীতির ভিত্তিতে বিভাজিত হওয়া সাংবাদিকদের সবচেয়ে দুর্বল করেছে। এই বিভাজন সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিভাজনের কারণে বাইরে থেকে যেসব চ্যালেঞ্জ আসছে, সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা হয়রানির শিকার হলে তার বিরুদ্ধে আগের মতো সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানও দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে একজন সাংবাদিককে আদালতে যেতে হবে, এটা কাম্য হতে পারে না। আজ যদি প্রেস কাউন্সিল সক্রিয় করা হয়, প্রভাবমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আস্থার জায়গায় নেওয়া হয়, তাহলে এই প্রতিষ্ঠানই সাংবাদিকদের পেশাগত জবাবদিহি ও গুণগত মান অর্জনে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, সংবাদপত্র শিল্পে বড় বড় শিল্প গ্রুপের বিনিয়োগ এসেছে, এটা আশার সঞ্চার করে। কিন্তু আবার সংবাদপত্র যদি কোনো গোষ্ঠীর অন্যায় কর্মকাণ্ডকে চেপে রাখে কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থেই ব্যবহূত হয়, তাহলে সংবাদপত্র গ্রহণযোগ্যতা হারায়। কারণ, কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব সংবাদপত্রের নয়। এ কারণে এই বড় বিনিয়োগও নতুন একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দেশের সংবাদপত্রগুলোকে জনস্বার্থ, ন্যায়বিচার, সুশিক্ষা, পরিবেশ, নারী সুরক্ষা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার মতো বিষয়গুলোতে সচেতনতা তৈরির কাজ চালিয়ে যেতে হবে। সাংবাদিকতা যেন হলুদ রং ধারণ না করে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অনারারি অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান বলেন, সাংবাদিকদের মধ্যে কোনো বিভাজন থাকা উচিত নয়। সাংবাদিকতা করতে এসে কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ দেখা যাবে না। পাকিস্তান আমলেও সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন বলে পাকিস্তানের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে পাকিস্তানজুড়ে কর্মসূচি পালন করতে পেরেছিলেন, যেটা সামরিক সরকারকেও বড় ধাক্কা দিয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, সংবাদপত্রের টিকে থাকারও একটা সংগ্রাম সব সময়ই আছে। গণতন্ত্র যত বিকশিত থাকে, সংবাদপত্র ততই বিকশিত হয়। এ জন্য সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করা সবচেয়ে জরুরি।

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম বলেন, বিচার বিভাগের প্রতি অনুরোধ, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে নিশ্চিত করুন। আইন অনুযায়ী একটা অভিযোগের জন্য একটাই মামলা হতে পারে। মানহানির ক্ষেত্রে সরাসরি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ মামলা করতে পারে না। কিন্তু একটা অভিযোগের জন্য সারাদেশে মামলা হচ্ছে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ছাড়া অনেকে বাদী হয়ে মামলা করছে, সেই মামলা আদালত আমলে নিচ্ছেন- এটা কীভাবে সম্ভব?

সংসদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয় এমন আইন সংশোধন করুন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি করা হয়েছিল, সেটা আমলে নেওয়া হয়নি। অথচ এখন প্রমাণ হয়ে গেছে, এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি, সাম্প্রদায়িক উস্কানি এবং সহিংসতার বিস্তার ঠেকাতে পারেনি। অথচ এ আইন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার সংকুচিত হচ্ছে। অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট একটি ঔপনিবেশিক আইন। তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গে এ আইন অকার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু সেই আইনে এখনও মামলা হচ্ছে। অথচ তথ্যদাতা বা সোর্সকে রক্ষার জন্য আইন নেই, হুইসেল ব্লোয়ার আইন নেই; সেই আইনগুলো করা হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সমৃদ্ধ হবে।

মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, যারা সংবাদপত্র শিল্পে বিনিয়োগ করছেন, তাদের বুঝতে হবে সংবাদপত্র শিল্প প্রচলিত আর দশটা শিল্পের চেয়ে আলাদা। এই শিল্পে পণ্য হচ্ছে সংবাদ। আর সংবাদের গুণগত মান নিশ্চিত করে তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা এবং বিশ্বস্ততা। সেটা না থাকলে সেই সংবাদপত্র গ্রহণযোগ্য হয় না। মালিকদের সবার আগে সাংবাদিকদের সম্মান করা শিখতে হবে; সাংবাদিকতা পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

তিনি সাংবাদিকদের পেশার প্রতি দায়িত্বশীলতা ও সম্মানবোধ বজায় রেখে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের অনুরোধ জানান। সম্পাদকদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করারও অনুরোধ জানান তিনি।

নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীর বলেন, সবার আগে গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার কথা বলতে হবে। ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ সবকিছুর বড় লক্ষ্য ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতা। যদি গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকে, তাহলে সাংবাদিকতা বিকশিত হয়; আবার সাংবাদিকতা যত বিকশিত হয়, গণতন্ত্র তত মজবুত হয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমনিতে আজকের অবস্থানে আসেনি। কারণ, তাদের সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সব সময়ই সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন বিখ্যাত সাংবাদিক-কলামিস্ট পিয়ারসন যুদ্ধ পরিকল্পনা-সংক্রান্ত গোপন বৈঠকের তথ্য প্রকাশ করে কলাম লিখেছিলেন, তখন তাকে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থবিরোধী কাজের জন্য আটক করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন কিছু কর্মকর্তা। কিন্তু সেই বিভাগের প্রধান তাদের বললেন, ‘পিয়ারসন ইজ মাই বেস্ট ইন্সপেক্টর জেনারেল। রেসপেক্ট হিম।’

তিনি বলেন, এখন অবস্থা হচ্ছে একজন এমপি, মন্ত্রীর কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখলেও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়ে যায়। বিবেক-বুদ্ধির প্রয়োগ করে, যুক্তি দিয়ে কোনো মতামত তুলে ধরলে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। মানুষের যুক্তি-বুদ্ধির প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্নেষণ করার স্বাধীনতা যদি না থাকে, তাহলে সাংবাদিকতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জায়গাটি আর থাকে না। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ছাড়া সত্যিকার অর্থে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।

ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, বাংলাদেশে এখন ঢাকা থেকে বের হচ্ছে ৫০২টি দৈনিক পত্রিকা। গণমাধ্যম ছিল ইতিহাসে সংগ্রামের অনুষঙ্গ। যে কারণে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান বাহিনীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে সংবাদপত্র অফিস ছিল। জাতীয় প্রেস ক্লাব ভবন ছিল। সেখানে গুলি, গোলা ছোড়া হয়েছে। এরশাদ আমলে গণতন্ত্রের জন্য একসঙ্গে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ রাখা সম্ভব হয়েছে। মনে হয় না, সাংবাদিকদের জন্য সে ধরনের ঐক্য আর কখনও দেখা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, বড় বড় শিল্পমাধ্যম যারা নানা ধরনের গণমাধ্যম নিয়ে আসছে, তারা প্রত্যেকে কোনো না কোনো স্বার্থে নিয়ে আসছে। তারা গণমাধ্যমের বিকাশ ঘটাতে আসছে না। ফলে গণমাধ্যম শিল্প হিসেবে দাঁড়াচ্ছে- সেটা জোর দিয়ে বলা যায় না। কে সংবাদপত্রের মালিক হবেন, তার কোনো নীতিমালা আছে কি? তাহলে আমরা কার কথা বলব, কোন গণমাধ্যমের কথা বলব? আর সমাজ এখন বেশি অসহিষ্ণু হয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িকতার বিষ বেড়েছে। এর মধ্যে কীভাবে মুক্ত গণমাধ্যম হবে, মুক্তবুদ্ধির চর্চা হবে। একটি কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনব্যবস্থা যখন প্রবলভাবে দেশ শাসন করবে, তখন গণমাধ্যম কীভাবে তার স্বাধীন চর্চা করবে? এ জায়গা থেকেই চিন্তা করতে হবে, আগামীর চ্যালেঞ্জ কী?

সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, এরশাদ শাসনামলে সে সময়ে অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে, গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের অংশ হিসেবে সপ্তাহজুড়ে সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ রাখা সম্ভব হয়েছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এসে সাংবাদিকদের সেই বজ্রকঠিন ঐক্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, বেতার-অনলাইন-সাংবাদিকতার সংখ্যা ও গুণগত সম্প্রসারণ হয়েছে। কিন্তু পেশাগত ঐক্যের স্বপ্ন ক্রমেই ফিকে হয়েছে। সাংবাদিকদের অনৈক্যের সুযোগ নিয়েছে সুবিধাবাদী সব গোষ্ঠী। এই আত্মসমালোচনা আমাদের করতে হবে।

তিনি বলেন, কেবল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল কিংবা অর্থশালী পেশাজীবী গোষ্ঠীর চিরায়ত প্রবণতার কথা বলছি না, স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে সংবাদমাধ্যমে আরও কিছু নতুন নতুন প্রতিপক্ষ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেভাবে কথায় কথায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক।

তিনি আরও বলেন, সরাসরি আঘাত ছাড়াও স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধের আরেকটি হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বহুল আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিপুল সম্প্রসারণের এই যুগে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন ও বিধিবিধানের প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু এর নামে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের অধিকার ও কর্মপরিবেশ সীমিত, এমনকি খর্ব করার ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আলোচনায় অংশ নিয়ে মতামত তুলে ধরে প্রবীণ সাংবাদিক ফাইন্যান্সিয়াল হেরাল্ড সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আজকে সরকার থেকে শুরু করে পাচারকারী, মাদক কারবারি, দুর্বৃত্ত সবার প্রতিপক্ষ হচ্ছে সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিক। তিনি বলেন, এখন সাংবাদিকতার সঙ্গে সরকারের এমন সংযুক্তি ঘটেছে যে তোষামোদী আর বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা একাকার হয়ে গেছে, কোনোটা আর আলাদা করা যায় না।

ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান বলেন, গণমাধ্যমের বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, এখন আগামীর চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভাবতে হবে। আগামী দিনে গণমাধ্যমে কী ধরনের বৈচিত্র্য আসবে, সংবাদপত্র কীভাবে টিকে থাকবে- সেসব চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে। বিজ্ঞাপন দিন দিন কমে যাচ্ছে। অনলাইন বিজ্ঞাপন সেটা প্রতিস্থাপনও করতে পারছে না। এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, দৈনিক আজাদী ৬২ বছর ধরে টিকে আছে। কারণ, আজাদী চট্টগ্রামের পাঠকের চাহিদা পূরণ করতে পেরেছে। পাশাপাশি আয়ের পথও ধরে রেখেছে। তিনি বলেন, মফস্বলে সাংবাদিকতার যে চ্যালেঞ্জ আর রাজধানীতে সাংবাদিকতার যে চ্যালেঞ্জ, তার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। এটা বুঝতে হবে। মফস্বলে বসে একজন ডিসির সমালোচনা করে লেখাও অনেক সময় কষ্টকর হয়ে যায়; কিন্তু রাজধানীতে বসে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনাও করা যায় স্বচ্ছন্দে। অতএব, গণমাধ্যমের আগামী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মফস্বল ও রাজধানীকে সেভাবেই বিবেচনায় নিতে হবে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.